বর্তমান যুগ হলো তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। এখন মানুষ খুব সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তের মধ্যে জানতে পারে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি একটি বড় সমস্যা হলো—ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া। অনেক সময় কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। সম্প্রতি এমনই একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয় ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা একটি মহিলা মাদ্রাসায় হামলা চালিয়েছে। কিন্তু তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, এই দাবির কোনো সত্যতা নেই।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি একটি ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয়। ভিডিওটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ১৪ সেকেন্ড। সেখানে একজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “ভারতের একটি মহিলা মাদ্রাসার ভেতর প্রবেশ করে হামলা চালিয়েছে হিন্দু উগ্রবাদীরা। চুপ থাকলে চলবে না ভাই। সারা বিশ্বের মুসলমান এক হয়ে প্রতিবাদ করতে হবে। রুখে দাঁড়াতে হবে।” ভিডিওতে আরও দেখা যায়, বোরকা ও হিজাব পরিহিত কয়েকজন নারী আতঙ্কিত অবস্থায় একটি মাঠে ছোটাছুটি করছেন। এমন দৃশ্য দেখে স্বাভাবিকভাবেই অনেক মানুষ ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
ইয়েমেনী সংবাদ মাধ্যম এর প্রতিবেদন দেখে নিন
কিন্তু পরে বিভিন্ন তথ্য যাচাইকারী সংস্থা ভিডিওটির প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে। ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম “দ্য ডিসেন্ট” অনুসন্ধান করে জানায়, ভিডিওটি ভারতের নয়। বরং এটি ২০২৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার উত্তরে একটি মেয়েদের স্কুলে সংঘটিত হামলার ভিডিও। রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে “Yemeni Radar #YemenCantWait” নামের একটি এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের হামদান এলাকায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়েছিল।
ইয়েমেনি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষে স্কুল কর্তৃপক্ষ একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হুথি মিলিশিয়ারা স্কুলে প্রবেশ করে এবং ছাত্রীদের বের করে দেয়। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কুল কর্তৃপক্ষ হুথিদের স্লোগান ও পতাকা টানাতে অস্বীকৃতি জানানোয় এবং কিছু ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে রাজি না হওয়ায় এই হামলা চালানো হয়। ফলে স্কুলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীরা ভয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সব তথ্য সত্য নয়। অনেক সময় একটি দেশের ঘটনা অন্য দেশের নামে প্রচার করা হয়, যাতে মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং সমাজে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ভুয়া তথ্য ছড়ানো খুবই বিপজ্জনক। এটি মানুষের মধ্যে ঘৃণা, অবিশ্বাস ও সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাই আমাদের সবার উচিত কোনো খবর বা ভিডিও দেখেই তা বিশ্বাস না করা। আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। বর্তমানে ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং রিভার্স ইমেজ সার্চের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো গুজব ও অপপ্রচার থেকে দূরে থাকা এবং অন্যদেরও সচেতন করা।
সবশেষে বলা যায়, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ভারতের কোনো মহিলা মাদ্রাসায় হামলার নয়; এটি ইয়েমেনে একটি মেয়েদের স্কুলে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার ভিডিও। তাই মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি না করে সত্য যাচাই করে দায়িত্বশীল আচরণ করা সবার কর্তব্য।
