প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট নিজের জন্য সময় বের করতে পারলে তা আপনার মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাইন্ডফুলনেস বা সচেতনভাবে বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস অযথা দুশ্চিন্তা কমাতে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নিজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। শুধু তাই নয়, একটি সচেতন মুহূর্তের ইতিবাচক প্রভাব কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলেও গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বর্তমান সময়ে মানসিক চাপ যেন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কাজের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—এসব কারণে অনেকেই সারাক্ষণ মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন। ফলে একই নেতিবাচক চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকে, মনোযোগ কমে যায় এবং ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে আশার খবর দিয়েছে Mindfulness সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা। গবেষকদের মতে, প্রতিদিন অল্প সময়ের জন্য সচেতনভাবে বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া মস্তিষ্ককে অপ্রয়োজনীয় চিন্তার চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত হতে সাহায্য করে। এর ফলে মন শান্ত হয়, উদ্বেগ কমে এবং ইতিবাচক অনুভূতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
শান্তি রাখতে গিয়ে কি নিজেকেই হারাচ্ছেন? ফনিং (Fawning) কী ও এর ক্ষতি
কীভাবে পরিচালিত হয় গবেষণা?
গবেষণায় ২৬৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের একটি অংশকে আট সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ মিনিট মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন করতে বলা হয়। এই অনুশীলনের মধ্যে ছিল শ্বাস-প্রশ্বাসে মনোযোগ দেওয়া, বডি স্ক্যান মেডিটেশন, সচেতনভাবে খাবার খাওয়া এবং প্রতিদিনের একটি সাধারণ কাজ পুরো মনোযোগ দিয়ে করা।
গবেষকেরা স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে দিনে চারবার অংশগ্রহণকারীদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। ফলে প্রতিদিনের ছোট ছোট মানসিক পরিবর্তনও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়।
কী জানা গেল?
গবেষণায় দেখা গেছে, যেদিন অংশগ্রহণকারীরা বেশি মাইন্ডফুল ছিলেন, তার পরের দিন তাদের মাথায় ঘুরতে থাকা অযথা ও নেতিবাচক চিন্তা কমে যায়। একই সঙ্গে মনোযোগ নষ্ট করে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তার সংখ্যাও কমতে শুরু করে। এরপরের দিন তাদের মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মাত্রা কমে এবং নিজের প্রতি সহানুভূতি ও ইতিবাচক অনুভূতি বাড়ে।
গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তনগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ, প্রথমে নেতিবাচক চিন্তা কমে, তারপর নিজের প্রতি সহানুভূতি বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত মানসিক সুস্থতার উন্নতি ঘটে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একটি সচেতন মুহূর্তের এই ইতিবাচক প্রভাব প্রায় চার দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
মাইন্ডফুলনেস কী?
মাইন্ডফুলনেস বলতে বোঝায় বর্তমান মুহূর্তে সম্পূর্ণ সচেতনভাবে থাকা। অতীতের ভুল কিংবা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় ডুবে না থেকে, এই মুহূর্তে কী ঘটছে—তা বিচার না করে গ্রহণ করা এবং মনোযোগ দেওয়া।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চা পান করার সময় যদি শুধু চায়ের স্বাদ, গন্ধ ও উষ্ণতার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়, অথবা হাঁটার সময় শুধু হাঁটার অনুভূতি ও চারপাশের পরিবেশ লক্ষ্য করা হয়, সেটিও মাইন্ডফুলনেসের সহজ অনুশীলন।
কেন এটি কার্যকর?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই একই সমস্যা বা উদ্বেগ নিয়ে বারবার চিন্তা করতে থাকে। মনোবিজ্ঞানে একে রুমিনেশন বলা হয়। এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে উদ্বেগ, মানসিক চাপ এমনকি বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
মাইন্ডফুলনেস অনুশীলনের সময় মানুষ যখন নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস বা বর্তমান কাজের দিকে মনোযোগ দেয়, তখন মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য সেই নেতিবাচক চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসে। এর ফলে মন শান্ত হয় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
আপনার সঙ্গী আপনাকে মূল্যায়ন করে না, করণীয় কী?
প্রতিদিন কীভাবে শুরু করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইন্ডফুলনেস শুরু করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট সময় দিলেই অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।
এর জন্য আপনি—
- শান্ত পরিবেশে বসে কয়েক মিনিট শ্বাস-প্রশ্বাসে মনোযোগ দিতে পারেন।
- খাবার খাওয়ার সময় মোবাইল ফোন দূরে রেখে শুধু খাবারের স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করতে পারেন।
- হাঁটার সময় চারপাশের পরিবেশ লক্ষ্য করতে পারেন।
- কোনো নেতিবাচক চিন্তা এলে সেটিকে জোর করে দূরে সরানোর চেষ্টা না করে শুধু লক্ষ্য করুন এবং ধীরে ধীরে মন বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনুন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাইন্ডফুলনেস মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। তবে এটি কোনো চিকিৎসার বিকল্প নয়। যদি কারও দীর্ঘদিন ধরে তীব্র উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অন্য কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, তাহলে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ছোট ছোট অভ্যাস অনেক সময় বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট সচেতনভাবে বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস হয়তো জীবনের সব সমস্যা দূর করবে না, তবে এটি অযথা দুশ্চিন্তা কমাতে, মনকে শান্ত রাখতে এবং মানসিক সুস্থতা উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ব্যস্ততার মাঝেও নিজের জন্য প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় বের করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি মূল্যবান বিনিয়োগ হতে পারে।
