ডেস্ক রিপোর্ট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক আলোচনা কেন দিন দিন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে? নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, এর জন্য শুধু ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম দায়ী নয়। বরং একটি দেশের গণতন্ত্রের মান এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য অনলাইন রাজনৈতিক আচরণকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Human Behaviour-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে গণতন্ত্র তুলনামূলক দুর্বল এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বেশি, সেসব দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা রাজনৈতিক বিদ্বেষ, ঘৃণামূলক মন্তব্য, কটূক্তি এবং অনলাইন হয়রানির বেশি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
শরীরের কী দরকার, আগে বুঝে পাকস্থলী! ক্ষুধা নিয়ে নতুন গবেষণা
কেন করা হয়েছে এই গবেষণা?
ইন্টারনেট জনপ্রিয় হওয়ার শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাড়াবে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে কম গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে গেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক আলোচনা প্রায়ই ব্যক্তিগত আক্রমণ, ঘৃণামূলক ভাষা, বিভাজন এবং অনলাইন হয়রানিতে রূপ নেয়।
এ কারণেই গবেষকরা জানতে চেয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বৈরিতা বাড়ার জন্য শুধু প্রযুক্তি দায়ী, নাকি একটি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সমানভাবে দায়ী।
কীভাবে পরিচালিত হয়েছে গবেষণা?
গবেষণাটি বিশ্বের ৩০টি দেশের ১৫ হাজার ২০২ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে পরিচালিত হয়।
অংশগ্রহণকারীদের গত ৩০ দিনের রাজনৈতিক আলোচনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। তারা কতবার রাজনৈতিক অপমান, কটূক্তি, ঘৃণামূলক মন্তব্য কিংবা অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন, সেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়। একই সঙ্গে তারা নিজেরাও অন্যদের প্রতি এমন আচরণ করেছেন কি না, তাও মূল্যায়ন করা হয়।
পরে গবেষকরা এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশের গণতন্ত্রের মান ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সূচকের সঙ্গে তুলনা করে বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে গণতন্ত্রের মান কম, সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক হিংসা, ঘৃণা ও বৈরিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
একই সঙ্গে যেসব দেশে আয়-বৈষম্য বেশি, সেসব দেশেও রাজনৈতিক কটূক্তি, বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য এবং অনলাইন হয়রানির ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য মানুষের মধ্যে সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং প্রভাব ধরে রাখার প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেয়। এই প্রতিযোগিতার প্রভাব অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আচরণেও প্রতিফলিত হয়।
অনলাইন আচরণ বাস্তব জীবনেরই প্রতিফলন
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, যারা বাস্তব জীবনের রাজনৈতিক আলোচনায় আক্রমণাত্মক আচরণ করেন, তারাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই ধরনের আচরণ করার প্রবণতা বেশি দেখান।
অর্থাৎ, অনলাইন রাজনৈতিক বিদ্বেষের জন্য শুধু অ্যালগরিদম বা প্রযুক্তিকে দায়ী করলে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তব জীবনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বলাৎকারের শাস্তি কী?
তরুণ পুরুষদের মধ্যে প্রবণতা বেশি
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, রাজনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক আচরণের প্রবণতা তরুণ পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়।
গবেষকদের মতে, অনেক কম গণতান্ত্রিক দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত বেশি হওয়ায় রাজনৈতিক বৈরিতার মাত্রাও তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক হিংসা ও ঘৃণা কমাতে শুধু প্ল্যাটফর্মগুলোর নীতিমালা কঠোর করলেই হবে না। এর পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।
গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক হিংসা, ঘৃণা ও বৈরিতা কোনো একক কারণের ফল নয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক বাস্তবতা অনলাইন আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই নিরাপদ ও ইতিবাচক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গড়ে তুলতে প্রযুক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
