১. ভূমিকাঃ
বাংলাদেশে বসবাসরত অনেক হিন্দু নাগরিক বিভিন্ন ব্যক্তিগত, সামাজিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস বা নাগরিকত্ব পেতে চান। কিন্তু নাগরিকত্ব চাইলেই পাওয়া যায় না। নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য প্রতিটি দেশের আলাদা আলাদা নিয়ম নীতি রয়েছে। অনেকে অবৈধভাবে ভারত গিয়ে অনৈতিক উপায়ে নাগরিকত্ব নিয়েছে, যা সঠিক পথ নয়। তবে বৈধভাবে কোন দেশের নাগরিকত্ব পেতে হলে নিয়মগুলো জানতে হবে। আজকের পোষ্টে বাংলাদেশে থাকা হিন্দুরা কিভাবে ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারে তার বিস্তারিত আলোচনা করব।
০২। নাগরিকত্বকেনগুরুত্বপূর্ণঃ
নাগরিকত্ব একটি দেশের স্থায়ী আইনি পরিচয়। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সেই দেশের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ভোটাধিকারসহ সকল নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে পারে।
৩. বাংলাদেশে বসে সরাসরি নাগরিকত্ব সম্ভব নয়ঃ
বর্তমানে আপনি যদি বাংলাদেশে বসবাস করেন, তাহলে সরাসরি ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা সম্ভব নয়। নাগরিকত্ব পেতে হলে আপনাকে ভারতে প্রবেশ করতে হবে। নাগরিকত্বের জন্য ভারতে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকা প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদে বসবাস করে প্রমাণ দেখাতে হয়। তাই নাগরিকত্ব পেতে হলে প্রথম ধাপই হলো বৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা।
৪. বৈধ ভাবে ভারতে প্রবেশের প্রক্রিয়াঃ
ভারতে যেতে হলে কিছু প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়: প্রথমেই একটি বৈধ পাসপোর্ট করতে হবে। তারপর ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। ভিসার বিভিন্ন ধরণ রয়েছে যেমন (Tourist, Entry, Medical) ভিসা ইত্যাদি। তারপর অন্যান্য ইমিগ্রেশন নিয়ম মেনে ভারতে প্রবেশ করতে হবে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অবৈধভাবে প্রবেশ করা যাবে না। অবৈধ প্রবেশ ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
৫. ভারতে গিয়ে LTV (Long Term Visa) গ্রহণঃ
ভারতে প্রবেশের পর অনেক বাংলাদেশী হিন্দু Long Term Visa (LTV) নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই ভিসার নেওয়া গেলে দীর্ঘ সময় ভারতে থাকার অনুমতি পাওয়া যায়। এটা সাধারণত ধর্মীয় সংখ্যালঘু অর্থাৎ বাংলাদেশের হিন্দুদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দেওয়া হয়। এর ফলে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না তবে নাগরিকত্বের জন্য সুযোগ তৈরি করে। LTV পাওয়া গেলে নাগরিকত্বের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়।
৬. ভারতে দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসঃ
নাগরিকত্ব পেতে হলে শুধু ভিসা থাকলেই হয় না, বাস্তবে সেখানে বসবাস করতে হয়। তবে এই সময় আপনাকে:
ক) স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (যেমন FRRO)-তে নিবন্ধন করতে হবে
খ) নিরবচ্ছিন্নভাবে ভারতে থাকতে হবে
গ) আইন–কানুন মেনে চলতে হবে
ঘ) নিজের ঠিকানা ও বসবাসের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে
ঙ) এই ধাপটি সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭. নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রধান উপায়ঃ
ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য দুটি প্রধান পথ রয়েছে: সাধার ণনিয়ম (Naturalization) ও বিশেষ আইন অনুযায়ী সুযোগ।
সাধারণ নিয়ম (Naturalization):
ক) কমপক্ষে ১১ বছর ভারতে বসবাস করতে হয়
খ) ভালো চরিত্র ও আইনি রেকর্ড থাকতে হয়
গ) সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে হয়
ঘ) এটি দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
বিশেষ আইন অনুযায়ী সুযোগঃ
২০১৯ সালে প্রণীত Citizenship Amendment Act 2019
অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এই আইনে: Bangladesh, Pakistan, Afghanistan থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানদের জন্য ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪–এর আগে ভারতে প্রবেশ করলে মাত্র ৫ বছর বসবাস করলেই নাগরিকত্বের আবেদন করা যায় । ২০১৪ সালের পরে গেলে এই সুবিধা সাধারণত প্রযোজ্য হয় না। তবে ভারত সরকার যে কোন সময় নাগরিকত্ব পাওয়ার সময়সীমা বর্ধিত করে ২০১৪ সালের পরিবর্তে বৃদ্ধি ২০২৬ সালও করতে পারে। তাহলে বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়া আরো সহজ হবে।
৮. নাগরিকত্বের জন্য আবেদন প্রক্রিয়াঃ
যোগ্যতা পূরণ অনলাইনে আবেদন ফর্ম পূরণ করতে হয় । প্রধান কাগজপত্র: পাসপোর্ট ও ভিসা, LTV সংক্রান্ত নথি, ভারতে বসবাসের প্রমাণ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয় । এরপর সরকার যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়।
৯. ভারতের নাগরিকত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাঃ
শুধু ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না। সব কিছু আইনি পথে করতে হবে । অবৈধ প্রবেশ করলে ভবিষ্যতে সমস্যা হবে ।পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ৫–১২ বছর সময় লাগতে পারে।
১০. উপসংহারঃ
বাংলাদেশে থাকা একজন হিন্দুর জন্য ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব। তবে এটি সহজ বা দ্রুত কোনো প্রক্রিয়া নয়। সঠিক নিয়ম মেনে, ধৈর্য ধরে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রেখে ধাপে ধাপে এগোতে হয়। সংক্ষেপে বলা যায়: নাগরিকত্ব পেতে হলে বৈধভাবে ভারতে যাওয়া > দীর্ঘ সময় বসবাস>আইনি শর্ত পূরণ ও নাগরিকত্বের আবেদন করা । এই পথ অনুসরণ করলেই সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
